নতুন আলো

ব্লগ : ১


জানালা দিয়ে রাস্তায় চোখ পড়ল বিভার। পাড়ার কয়েকটা ছেলেমেয়ে ফুলঝুরি আর রংমশাল জ্বালতে ব‍্যস্ত। চারদিকে আলোর রোশনাই এর মাঝে ওদের মুখে হাসির ঝলকানিতে যেন পরিবেশটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা থেকে সরে এল সে। ফ্রিজ় খুলে সবজি বের করে রান্নায় মন দিল। গত কয়েক বছর ধরে এই রুটিনেই তার জীবন চলছে। চাকরি পেয়ে বাড়ি থেকে দূরে চলে আসা, তারপর ফ্ল‍্যাট ভাড়া নিয়ে নিজের মতো একার সংসার গোছানো। উৎসবের মরশুমে একা লাগে ঠিকই, কিন্তু মানিয়ে নিতে হয়। রান্না সেরে খেয়ে নেয়। এরপরের সঙ্গী তো ওয়েব সিরিজ আছেই, নাহলে গল্পের বই, ম‍্যাগাজিন ইত্যাদি। অন‍্য দিন অফিসের কাজেই সারাদিন চোখের পলকে কেটে যায়। এসব ছুটির দিন এলে তাই যেন সময় তার কাটতেই চায় না।

বিভার বয়স ত্রিশের ঘর পেরোব পেরোব করছে। বাড়ি থেকে হালকা বিয়ের চাপ যে আসছে না, তা নয়। তবুও তার যেন মনেহয় বিয়ে করার জন্য উপযুক্ত সঙ্গী এখনও সে পায়নি। অনেক সম্বন্ধ দেখা হয়েছে, তার মতো দক্ষ, বুদ্ধিমতী ফাইন‍্যানশিয়াল অ্যাডভাইজার-কে অর্ধাঙ্গিনী বানানোর সুযোগও অনেকেই হাতছাড়া করতে চায়নি। কিন্তু বিভা তাদের কারুর সঙ্গেই নিজেকে একাত্ম করার কথা ভাবতে পারেনি। কোথাও একটা গিয়ে তার মনে হয়েছে তাল কেটে যাচ্ছে। যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে জীবনটা। প্রতিটা সম্বন্ধ তাই তাকে কাটিয়ে যেতে হয়েছে। এই নিয়ে অশান্তিও কম হয়নি বাড়িতে। একটা সময়ে তাই নিজেকে একটু মুক্তি দিতে বাড়ি ছেড়ে অফিসের কাছাকাছি ভাড়া নিয়ে চলে এসেছে সে।

খাওয়া সেরে নেটফ্লিক্স চালু করে বিভা। একটা নতুন সিরিজের নোটিফিকেশন এসেছে। জঁরটা পছন্দ হতেই দেখতে শুরু করে। আধ ঘন্টা হয়েছে সবে, ফোনে নোটিফিকেশন ঢুকল - ফেসবুকে মেসেজ ঢুকেছে একটি প্রোফাইল থেকে।

"নমস্কার, বিভা। আমি মল্লিকা। শুভ দীপাবলি। ফেসবুকে আমরা একে অপরের বন্ধু তালিকায় থাকলেও একদিনও কথা হয়নি সেভাবে। আশা করি, আমাকে তোমার মনে আছে। দু-তিন বছর আগে কৌশিক দত্তের বাড়িতে দিওয়ালি পার্টিতে আমাদের দেখা হয়েছিল। মেসেজ করব করব ক‍রেও এতদিন করা হয়নি। তুমি খুব ব‍্যস্ত থাকো, জানি। তাও বলছি, তোমার পারফরম্যান্স সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। আমাদের কোম্পানিতে তুমি জয়েন পারলে দু'পক্ষেরই লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি তুমি ইনটারেস্টেড থাকো, আমাকে ফোন কোরো। পরে নাহয় অফিশিয়ালি এই বিষয়ে এগোনো যাবে। আমার ফোন নম্বর - ৯৮৭৪৫৬৩০০০। কথা হবে। ইনটারেস্টেড না থাকলেও ফোন কোরো, আড্ডা হবে। বহুদিন কথা হয়নি তোমার সঙ্গে।"

সিরিজটা বন্ধ রেখে মেসেজটা পড়ে বিভা কয়েক মিনিট থমকে গেল। আলাপের ব‍্যাপারটা মনে পড়লেও মল্লিকার মুখটা মনে পড়ছে না সেভাবে। ফেসবুকেও ছবি নেই। কিছুক্ষণ ভেবে নম্বরটা ডায়াল করেই ফেলল‌। ওপাশে রিং হচ্ছে।

― হ‍্যালো?

― হ‍্যা..হ‍্যালো? বিভা বলছি। মল্লিকা, রাইট? ইউ মেসেজড মি। আই ওয়াজ় ফ্রি। সো, থট অফ কলিং ইউ। কেমন আছো?

― ওহ্, বিভা। সো গুড টু হিয়ার ইয়োর ভয়সে এগেইন। আই অ্যাম ওয়েল। হাউ আর ইউ? এত তাড়াতাড়ি তুমি রেসপন্ড করবে, ভাবিনি। আজ তো কালীপুজো। কিছু করছো না? এখন তো সবে সন্ধ্যা। আমি পাগলি তাই এই দিনে এই সময়ে এসব বিষয়ে বিরক্ত করলাম।

― আরে না না। ইটস ওকে। আমি তো একাই থাকি। ভীষণ বোর হচ্ছিলাম। তুমি ভালোই করেছো পিং করে। সত্যিই ফেসবুকে এতদিন রয়েছি, কথাই হয়নি আমাদের।

― একা কেন? ইজ নট ইয়োর হাজব‍্যান্ড হোম? আজ তো ছুটি।

― আয়‍্যাম নট ম‍্যারেড ইয়েট।

― ওহ্ হো! তাহলে তো বাড়িতে বাবা, মায়ের সঙ্গে থাকার কথা। কোথায় যেন তোমার বাড়ি?

বিভার একটু বিরক্ত লাগে। কাজের জন্য ফোন করতে বলে পারসোনাল লাইফের খবর নিচ্ছে। আচ্ছা জ্বালা হল তো! নাকি ও নিজেই একা থাকতে থাকতে এমন অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে?

― আমার বাড়ি সোদপুরে গো। কিন্তু এখন আমি নিউটাউনেই ফ্ল‍্যাট ভাড়া নিয়ে থাকি।

― অ্যাই সত্যিই? আমিও তো নিউটাউনেই থাকি। যে কফিহাউসটা ওপেন হয়েছে, তার কাছেই আমার ফ্ল‍্যাট।

― তাই? বাহ্! আমিও এই দিকেই।

― আরেহ্! এ তো দারুণ ব‍্যাপার হল। চলো না এখন তাহলে একটু কফিহাউসে যাই। ওখানে বসেই কথা বলা যাবে নাহয়?

বিভা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। আচ্ছা জ্বালায় ফেলল তো মেয়েটা? এখন আবার দেখা করতেও যেতে হবে?

― আসলে..

― কী? ছুটির দিনেও ব‍্যস্ত আছো? কোনো 'না' শুনব না। বোর যখন হচ্ছো, বেরোতেই হবে। আমিও বসেই আছি, বড় হওয়ার এই জ্বালা। কোনো কিছুতেই মন ভরে না। যাইহোক, আধ ঘন্টার মধ্যে চলে এসো। আমি বেরিয়ে ফোন করছি। টাটা!

টকাস করে ফোন কেটে দিয়েছে মল্লিকা। আচ্ছা পাগল তো! এভাবে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফোন কে কেটে দেয়? দেখা করে বেশ করে কথা শোনাবে, মনে মনে ভেবে নেয় সে। জিনস আর নতুন একটা টি-শার্ট গায়ে গলিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। বহুদিন পরে এভাবে দেখা করতে যাচ্ছে কারুর সঙ্গে - ফর্মাল, না, ইনফর্মাল সেটা এখনও জানা নেই। ফ্ল‍্যাটে তালা দিয়ে লিফট ধরে। হেঁটেই যাবে, কাছেই তো। ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করে। বড় রাস্তায় পড়তেই কাঁধে টোকা।

― এই যে ম‍্যাডাম! এভাবে মাথা নীচু করে হাঁটলে কিন্তু মানুষ না হোক গরু, বা, ষাঁড়ের গুঁতো খেতে হতেই পারে।

অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাতেই হলুদ রঙের কুর্তি পরিহিতা একটি মেয়েকে দেখতে পায় সে। কানে ঝুমকো দুল, চোখে কাজলের আঁচড়, কপালে সরু ভ্রু জোড়ার ঠিক মাঝে একটা ছোট্ট কালো টিপ - কি মিষ্টিই না দেখাচ্ছে মেয়েটাকে।

― মল্লিকা?

― এখনও সন্দেহ আছে? ডোন্ট টেল মি দ‍্যাট ইউ হ‍্যাভ ফরগটেন মাই ফেস!

কৃত্রিম রাগে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে সে বিভার দিকে। অদ্ভুত মায়া ভরা চোখ মল্লিকার।

হেসে ফেলে বিভা।

― হ্যাঁ, সত্যিই ভুলে গেছি। যোগাযোগ রাখলে তবে তো মনে থাকত!

― ওহ্! সব দায় বুঝি আমার একার? হাহ্! চলো এবার ভেতরে যাই, বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নাহলে।
কফি, ফিশ ফ্রাই অর্ডার করে দুজনে বসল।

― সত্যি করে বলোতো ঠিক কী জন্য দেখা করতে চাইলে তুমি?

― কেন আবার? বললাম তো মেসেজে। আমি চাই তুমি আমাদের কোম্পানি জয়েন করো। এইচ.আর. টিমে আছি বলে তোমাকে অ্যাপ্রোচ করছি। তোমার কারেন্ট স‍্যালারির তুলনায় হাইকও দেওয়া হবে।

― আই নিড সাম টাইম টু থিঙ্ক।

― অফকোর্স, টেক ইয়োর টাইম। কিন্তু প্লিজ় দেখো যদি আসা যায়।

― তুমি তোমার কথা বলো! এখানে কার সঙ্গে থাকো? হাজব‍্যান্ড?

― ডিভোর্স হয়ে গেছে বছর দুয়েক হল। একাই থাকি এখানে।

― ওহ্ সরি!
― ডোন্ট বি! আমি সত্যিই ভালো আছি এখন। জোর করে কোনো সম্পর্ক না টানাই ভালো। অনেক স্বাধীন আমি এখন। মন থেকে যাকে মেনে নিতে পারিনি কোনোদিন, বাড়ির চাপে পড়ে তাকে আমার জীবনে আসার অনুমতি দেওয়াও উচিৎ হয়নি।

এরপর বেশ কিছুক্ষণ নৈঃশব্দ্য ঘিরে থাকল ওদের। নিস্তব্ধতা ভাঙ্গল বিভা।

― লেটস মুভ অন। তোমার কথা বলো, শুনি।

কথায় কথায় কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে ঘড়ি দশটার কাঁটা ছুঁয়েছে, দুজনেই খেয়াল করেনি। কফিহাউস থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথ ধরল দুজনেই। মল্লিকার অ্যাপার্টমেন্টটা আগে পড়ে। গেটের কাছে এসে হেসে মল্লিকা হাত নাড়ল।

― গুট নাইট ম‍্যাডাম! দেখা হবে আবার কখনও! আমার প্রপোজালটার কথা ভুলে যেও না যেন।

― উফ্! এত প্রফেশনাল তুমি! যাইহোক, তোমার চোখগুলো আর হাসিটা খুব সুন্দর। কেউ বলেছে তোমাকে?

― নাহ্! মিথ‍্যে করে হলেও বলবে তো এসব মাঝে মধ্যে? ভালো লাগবে বেশ।
― সত্যিই বলব! ডোন্ট ওয়ারি!

আচমকা মল্লিকা লাফিয়ে হাত তালি দিয়ে উঠল।

― ওয়াও! বিভা, কি সুন্দর দেখো তুবড়িটা! বাচ্চাগুলো জ্বালাচ্ছে! অপূর্ব! বাজি ফাটানো মিস করছি ভীষণ। জ্বালাবে? চলো না ওদের থেকে নিয়ে কটা জ্বালাই।

বিভার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে সে তাকে টানতে টানতে নিয়ে চলল। ছেলেগুলোর থেকে চেয়ে বিভার হাতে একটা রংমশাল ধরিয়ে দিয়ে একগাল হেসে বলল - "মজা হচ্ছে না? হি হি হি!"

মল্লিকার সারল‍্যে মাখা উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বিভা জিজ্ঞাসা করে বসল - "আমার সঙ্গে থাকবে মল্লিকা? তোমার সঙ্গে ছক ভাঙ্গা জীবন কাটাব, তোমার সঙ্গে রংমশাল কাটাব জীবন।"

থতমত খেয়ে যায় মল্লিকা।

― আমি..মানে..আমরা...

― বন্ধুত্ব দিয়েই শুরু করি আপাততঃ আমরা? জীবন যা দেবে, মাথা পেতে নেব। তোমার সঙ্গে এই কিছুক্ষণ কাটিয়েই যেন নিজের সঙ্গে একাত্ম বোধ করলাম প্রথমবার। তাই..

― আমি কিন্তু মাছ ভীষণ ভালোবাসি। তুমি না খেলে আমি একা একাই খাব। চলবে তো?

বিভা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।

দীপাবলির আলোয় চারপাশে তখন মুখরিত। পাড়ায় কোনো প‍্যান্ডেলে গান বাজছে ―
সকলি তোমারি ইচ্ছা,
ইচ্ছাময়ী তারা তুমি.."

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

কল্পকথা

উপলব্ধি