ভাইফোঁটা
ব্লগ : ৩
গুলতি লইয়া এক টিপে দুটি পেয়ারা পাড়িয়া লইল অপু। আজ ভাইফোঁটা। দুর্গা দিদি ওকে ফোঁটা দিবে। লুকাইয়া দেখিছে সে, দিদি কী সব বানাইতেছে অপুকে উপহার দিবে বলে। অপুরও দিতে ইচ্ছা হইছে তাই।
পেয়ারা দুখানি কোঁচরে ফেলিয়া বাঁশবাগানের দিকে ছুটিল। কয়েকটা চ্যাপটা আকারের পাথর কোঁচরে ভরে নিল। "এবার বাড়ি যাই, দিদি হয়তো খুঁজছে", মনে মনে বিড়বিড় করিতে করিতে অপু বাড়ির পথ ধরিল।
উঠোন পেরোতে না পেরোতেই বুঝিল অতি সুস্বাদু কিছু রান্না হইতেছে। রান্নাঘরে মুখ বাড়াইতেই দুর্গা 'হাঁ হাঁ' করিয়া উঠিল, "খবরদার এখানে আসবিনে অপু। দাওয়ায় গিয়ে আসন নিয়ে বসগে যা।" ছেলে, মেয়ের কাণ্ড দেখিয়া সর্বজয়া হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল ― "উফ্! ভারি ভাইফোঁটা হচ্চে বটে তোদের! চল অপু, আমি আসন পেতে দিচ্চি।"
অপু একগাল হাসিয়া দিদির কথা মতো আসনে বসিয়া পড়িল। দুর্গা রান্নাঘর হইতে থালা সাজাইয়া অপুর সামনে বসিল। থালার পাশে একখানি প্রদীপ জ্বালাইল, পাশে ধান, দূর্বা, চন্দন। অপু বিস্ময়ে দেখিল থালায় খানচারেক গোল গোল সাদা রঙের ফোলা কিছু খাবার, সঙ্গে আলুর চচ্চড়ি। এমন খাবার সে কখনও দেখে নাই। দুর্গা ভাইয়ের বিস্ময়ভাব লক্ষ্য করিয়া হাসিয়া থুতনি ধরিয়া চুমু খাইয়া কহিল ― "এগুলোকে লুচি বলে, বুঝলি পাগল? তুই আগে কখনও খাসনি, তাই আজ মা আর আমি রাঁধলাম তোর জন্য।" অপু সলজ্জে মাথা নাড়িল। দুর্গা কনিষ্ঠ আঙ্গুলে চন্দন লাগাইয়া ভাইকে ফোঁটা দিল। ধান, দূর্বা দিয়া আশীর্বাদ করিল। মা ইশারা করিতে অপু দিদিকে প্রণাম করিল। ফোঁটা দেওয়া শেষ হইতেই দুর্গা শোওয়ার ঘর হইতে সেই বিশেষ উপহার আনিল যাহা ইতিপূর্বে অপু লুকাইয়া প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে। কাছে আনিবার পরে বুঝিল দিদি তাহার জন্য ঘুড়ি বানাইয়াছে আর একখানি কাপড়ের থলে। ভাইয়ের হাতে উপহারগুলি তুলিয়া দুর্গা কহিল ― "এই কটা ঘুড়ি বানিয়েচি তোর জন্য। আর এই ছোট্ট থলেটা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াস। সারাদিন কোঁচরে এটা সেটা কুড়িয়ে রাখিস, অনেক কিছু পড়ে যায়, দেখেচি। এবার থেকে থলেতে জমাবি।" অপু আরও লজ্জা পাইয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। এরপরে দুর্গা একটু লুচি ছিঁড়িয়া তাহাতে আলু চচ্চড়ি মিশাইয়া ভাইয়ের গালে পুড়িয়া দিল ― "কেমন খেতে বল?" অপুর চোখ দুখানি গোল গোল হইয়া গিয়াছে ― "লুচি এত ভালো খেতে হয়? আবার একদিন করে খাওয়াবি দিদি?" দুর্গা সশব্দে হাসিয়া ভাইকে খাওয়াইতে থাকে ― "সে হবে এখন!" হঠাৎ কী একটা মনে পড়িতেই অপু ছুটিয়া গিয়া দিদির জন্য সংগ্রহ করা উপহার নিয়া আসিল ― "আমিও তোর জন্য এগুলো এনেছি, দেখ দিদি। তুই তো পেয়ারা খেতে ভালোবাসিস, আর এই পাথর দিয়ে তুই পুকুরে ছুঁড়ে ব্যাঙ লাফানো খেলতে পারবি।" দুর্গা হতবাক হইয়া ভাবিতে থাকে, তার ভাই এত বুঝিতে শিখিয়া গেল কবে? ভাইকে কাছে টানিয়া লইয়া জড়াইয়া কপালে চুমু দিয়া দুর্গা বলিল ― "আমার কত বড় ভাই এল রে!" পেটে কাতুকুতু দিয়া ভাইকে অস্থির করিয়া তুলিল দুর্গা।
রান্নাঘরের চৌকাঠে বসিয়া ছেলেমেয়েদের দিকে তাকাইয়া হাসিয়া ভাবিতে থাকে সর্বজয়া ― "হে ঠাকুর! আমার ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখো। এভাবেই যেন ওরা হেসে খেলে দিন কাটাতে পারে। সংসারের অভাব অনটনের মধ্যেও এই যে কিছু মুহুর্ত ভালো থাকা, তা তো এদের জন্যেই!" বেলা পড়িয়া আসে। আশপাশের বাড়ি হইতে শঙ্খধ্বনি শোনা যাইতেছে, ভাইফোঁটা দেওয়া শুরু হইয়া গিয়াছে।
( এটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পথের পাঁচালি' উপন্যাসের তিন প্রধান চরিত্র - অপু, দুর্গা, সর্বজয়া - কে নিয়ে লেখা একটি কাল্পনিক ফ্যান ফিকশন মাত্র।)
গুলতি লইয়া এক টিপে দুটি পেয়ারা পাড়িয়া লইল অপু। আজ ভাইফোঁটা। দুর্গা দিদি ওকে ফোঁটা দিবে। লুকাইয়া দেখিছে সে, দিদি কী সব বানাইতেছে অপুকে উপহার দিবে বলে। অপুরও দিতে ইচ্ছা হইছে তাই।
পেয়ারা দুখানি কোঁচরে ফেলিয়া বাঁশবাগানের দিকে ছুটিল। কয়েকটা চ্যাপটা আকারের পাথর কোঁচরে ভরে নিল। "এবার বাড়ি যাই, দিদি হয়তো খুঁজছে", মনে মনে বিড়বিড় করিতে করিতে অপু বাড়ির পথ ধরিল।
উঠোন পেরোতে না পেরোতেই বুঝিল অতি সুস্বাদু কিছু রান্না হইতেছে। রান্নাঘরে মুখ বাড়াইতেই দুর্গা 'হাঁ হাঁ' করিয়া উঠিল, "খবরদার এখানে আসবিনে অপু। দাওয়ায় গিয়ে আসন নিয়ে বসগে যা।" ছেলে, মেয়ের কাণ্ড দেখিয়া সর্বজয়া হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল ― "উফ্! ভারি ভাইফোঁটা হচ্চে বটে তোদের! চল অপু, আমি আসন পেতে দিচ্চি।"
অপু একগাল হাসিয়া দিদির কথা মতো আসনে বসিয়া পড়িল। দুর্গা রান্নাঘর হইতে থালা সাজাইয়া অপুর সামনে বসিল। থালার পাশে একখানি প্রদীপ জ্বালাইল, পাশে ধান, দূর্বা, চন্দন। অপু বিস্ময়ে দেখিল থালায় খানচারেক গোল গোল সাদা রঙের ফোলা কিছু খাবার, সঙ্গে আলুর চচ্চড়ি। এমন খাবার সে কখনও দেখে নাই। দুর্গা ভাইয়ের বিস্ময়ভাব লক্ষ্য করিয়া হাসিয়া থুতনি ধরিয়া চুমু খাইয়া কহিল ― "এগুলোকে লুচি বলে, বুঝলি পাগল? তুই আগে কখনও খাসনি, তাই আজ মা আর আমি রাঁধলাম তোর জন্য।" অপু সলজ্জে মাথা নাড়িল। দুর্গা কনিষ্ঠ আঙ্গুলে চন্দন লাগাইয়া ভাইকে ফোঁটা দিল। ধান, দূর্বা দিয়া আশীর্বাদ করিল। মা ইশারা করিতে অপু দিদিকে প্রণাম করিল। ফোঁটা দেওয়া শেষ হইতেই দুর্গা শোওয়ার ঘর হইতে সেই বিশেষ উপহার আনিল যাহা ইতিপূর্বে অপু লুকাইয়া প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে। কাছে আনিবার পরে বুঝিল দিদি তাহার জন্য ঘুড়ি বানাইয়াছে আর একখানি কাপড়ের থলে। ভাইয়ের হাতে উপহারগুলি তুলিয়া দুর্গা কহিল ― "এই কটা ঘুড়ি বানিয়েচি তোর জন্য। আর এই ছোট্ট থলেটা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াস। সারাদিন কোঁচরে এটা সেটা কুড়িয়ে রাখিস, অনেক কিছু পড়ে যায়, দেখেচি। এবার থেকে থলেতে জমাবি।" অপু আরও লজ্জা পাইয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। এরপরে দুর্গা একটু লুচি ছিঁড়িয়া তাহাতে আলু চচ্চড়ি মিশাইয়া ভাইয়ের গালে পুড়িয়া দিল ― "কেমন খেতে বল?" অপুর চোখ দুখানি গোল গোল হইয়া গিয়াছে ― "লুচি এত ভালো খেতে হয়? আবার একদিন করে খাওয়াবি দিদি?" দুর্গা সশব্দে হাসিয়া ভাইকে খাওয়াইতে থাকে ― "সে হবে এখন!" হঠাৎ কী একটা মনে পড়িতেই অপু ছুটিয়া গিয়া দিদির জন্য সংগ্রহ করা উপহার নিয়া আসিল ― "আমিও তোর জন্য এগুলো এনেছি, দেখ দিদি। তুই তো পেয়ারা খেতে ভালোবাসিস, আর এই পাথর দিয়ে তুই পুকুরে ছুঁড়ে ব্যাঙ লাফানো খেলতে পারবি।" দুর্গা হতবাক হইয়া ভাবিতে থাকে, তার ভাই এত বুঝিতে শিখিয়া গেল কবে? ভাইকে কাছে টানিয়া লইয়া জড়াইয়া কপালে চুমু দিয়া দুর্গা বলিল ― "আমার কত বড় ভাই এল রে!" পেটে কাতুকুতু দিয়া ভাইকে অস্থির করিয়া তুলিল দুর্গা।
রান্নাঘরের চৌকাঠে বসিয়া ছেলেমেয়েদের দিকে তাকাইয়া হাসিয়া ভাবিতে থাকে সর্বজয়া ― "হে ঠাকুর! আমার ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখো। এভাবেই যেন ওরা হেসে খেলে দিন কাটাতে পারে। সংসারের অভাব অনটনের মধ্যেও এই যে কিছু মুহুর্ত ভালো থাকা, তা তো এদের জন্যেই!" বেলা পড়িয়া আসে। আশপাশের বাড়ি হইতে শঙ্খধ্বনি শোনা যাইতেছে, ভাইফোঁটা দেওয়া শুরু হইয়া গিয়াছে।
( এটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পথের পাঁচালি' উপন্যাসের তিন প্রধান চরিত্র - অপু, দুর্গা, সর্বজয়া - কে নিয়ে লেখা একটি কাল্পনিক ফ্যান ফিকশন মাত্র।)
ভালো হয়েচে, বেশ ভালো
ReplyDeleteধন্যবাদ 😇
Deleteবেশ অন্যরকম। ভালো লাগল
ReplyDeleteThanks. 😊
Delete